You are currently viewing গেম আর্ট বলতে আমি যা বুঝি

গেম আর্ট বলতে আমি যা বুঝি

 105 total views

লিখেছেনঃ পাপনজিৎ দে

গেম আর্ট কি?

এক কথায় বলতে গেলে, গেম খেলার সময় সামগ্রিকভাবে আমাদের চোখে যা কিছু দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তার সবকিছুকেই বস্তুত অর্থে গেম আর্ট বলা চলে। একজন গেম আর্টিস্ট এর কাজ হল একটি গেম-এর লিখিত বা কল্পিত আইডিয়াকে গেম ডিজাইনারের সাথে যথাযথভাবে যৌক্তিক (logical) এবং নান্দনিক (aesthetical) বিশ্লেষণ শেষে প্রাথমিকভাবে চিত্রিত রূপদান করা (concept art) এবং পর্যায়নুক্রমিক ভাবে শিল্প নির্দেশনা অনুযায়ী সেটিকে খসড়া থেকে গেমে ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতিতে হাতে-কলমে ও বিভিন্ন সফটওয়্যারের সাহায্য অবলম্বনে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক উপায়ে চূড়ান্ত দৃশ্য (final visual) রূপায়ণ করা।

সহজ করে বোঝার সুবিধার্থে একটু ভেঙ্গে বলি। এইযে যেমন ধরুন, মোটামুটি সব গেম-এই আমরা কমবেশি কমন কিছু 2D/3D জিনিসপত্র সচরাচর দেখে থাকি – ক্যারেক্টার, যন্ত্রাংশ,যানবাহন,ইনডোর-আউটডোর এনভায়রনমেন্ট,ঘরবাড়ি, দালানকোঠা,বিভিন্ন বস্তুসামগ্রী ও উপাদান (Props,assets and materials), পোষাক-পরিচ্ছদ,কালার,টেক্সচার,অ্যানিমেশান প্রভৃতি। এই সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় একটি গেম-এর সার্বিক দৃশ্যমান অনুভূতি (look and feel)। একটি গেম-এ ব্যবহৃত যাবতীয় ভিজুয়াল আর্টসমূহকে গেম আর্ট এর আওতায় ধরা হয়ে থাকে। এমনকি গেম ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে করে থাকা User Interface and Experience Art (UI/UX Art) গেম আর্ট-এরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গেম ডেভেলপমেন্ট এবং গেম আর্ট

গেম ডেভেলপমেন্ট এক অর্থে নান্দনিক শিল্প এবং তথ্য-প্রযুক্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন; যেখানে একজন গেম আর্টিস্ট বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি করে থাকে ডিজিটাল ড্রয়িং,প্রকাশধর্মী চিত্রকর্ম (expressive illustration), 3D মডেলিং,স্কাল্পটিং-সহ আরও অনেক ধরণের প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকর্ম যা গেম ডেভেলপারের কোডিং ও প্রোগ্রামিং এবং সাউন্ড ডেভেলপারের নির্মিত সুর ও ছন্দের সাথে যুক্ত হয়ে তৈরি করে একেকটা পরিপূর্ণ গেম। এই সম্মিলিত সৃষ্টি কখনো কখনো একজন গেমারের কাছে হয়ে ওঠে বাস্তবের চাইতেও জিবন্ত। ধরা হয়ে থাকে, এ যাবত কালে শিল্প ও বিজ্ঞানের সবচাইতে জনপ্রিয় মিশ্রণ হল গেম ডেভেলপমেন্ট। তাই বলা চলে,গেম আর্ট গেম ডেভেলপমেন্ট-এর এক অন্যতম মূল উপাদান যা একটি গেমকে প্রানবন্ত ও দৃশ্যমানভাবে খেলার উপযোগী করে তোলে।

গেম আর্ট-এর প্রকারভেদ 

প্রি-প্রডাকশান,প্রডাকশান ও পোষ্ট-প্রডাকশান এই তিনটি টাইমলাইনের উপর ভিত্তি করে গেম আর্ট-এর ধরণগুলো অনেকটা এরকম-

  • প্রি-প্রডাকশান পিরিয়ডে গেম আর্টঃ

কনসেপ্ট আর্ট ও স্টোরি বোর্ডিং

একটি গেমের ক্যারেক্টার, এনভায়রনমেন্ট, প্রপস, মুড ইত্যাদি কি কি এবং কেমন দেখতে হতে পারে এসব বিষয় সম্পর্কে প্রডাকশান টিমকে সম্যক ধারণা দেওয়ার জন্যে প্রোজেক্টের লক্ষ্যমাত্রার উপর ভিত্তি করে করা হয় বিভিন্ন কুইক স্কেচ, লে-আউট এবং স্টোরি বোর্ড যা সাধারণত একজন আর্ট ডিরেক্টর-এর তত্ত্বাবধানে এক বা একাধিক কনসেপ্ট আর্টিস্ট করে থাকেন। আর এর উপর ভিত্তি করে ফাইনাল ভিজুয়াল প্রডাকশন-এর টাইমলাইন এবং এসটিমেশান সেট করা হয়। এই স্তরে গেম আর্ট সত্যিকার অর্থে অনেক ইমাজিনেটিভ এবং চ্যালেঞ্জিং হয় কারণ কনসেপ্ট আর্ট হল এমন একটি মাধ্যম যা প্রডাকশান আর্টিস্টসহ সকল সদস্যদেরকেও গেমটির ভিজুয়াল ভিশন ইলাস্ট্রেট করে। একইভাবে স্টোরি বোর্ডিং সার্বিক গেমের মুড ও নাটকীয়তাকে দৃশ্যমান করে তুলে ধরে। প্রত্যেকটি প্রি-প্রডাকশান ফেইজে গেম আর্টের ধরণগুলো বেশ নিরীক্ষাধর্মী হয়ে থাকে।

ক্যারেক্টার কনসেপ্ট আর্ট

এনভায়রনমেন্ট কনসেপ্ট আর্ট

  • প্রডাকশান পিরিয়ডে গেম আর্টঃ

ক্যারেক্টার / এনভায়রনমেন্ট / প্রপ্স ডিজাইন

গেম আর্ট ক্যারিয়ারে সমগ্র বিশ্বে এটি একটি অতি জনপ্রিয় এবং চাহিদাসম্পন্ন সেক্টর যেখানে 2D এবং 3D গেম আর্টিস্টরা গেম ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড বিভিন্ন সফটওয়্যার (Adobe Photoshop, Adobe Illustrator, Autodesk Maya, Max, Blender, 3D Coat, Substance Painter) ইত্যাদি এবং সর্বোপরি traditional skill এর সমন্বয়ে ক্যারেক্টার, এনভায়রনমেন্ট ও প্রপ্স মডেলিং, রিটপোলজি, ইউভি সেটিং এবং টেক্সচারিং করে থাকেন। এই প্রফেশানের সবচাইতে চ্যালেঞ্জিং এবং ইন্টারেস্টিং পয়েন্টটি হল গেম স্পেসিফিক অবজেক্ট সমূহের চাহিদাগুলো যথাযথভাবে বুঝা এবং সে অনুযায়ী বিভিন্নভাবে ক্যারেক্টার ও অবজেক্টস তৈরি করতে পারা। এরইসাথে নতুন ও উপযোগী পদ্ধতি গুলো শিখতে থাকা এবং আর্ট ডিরেক্টর এর ভিশন অনুযায়ী স্টাইলাইজড অ্যাসেটস ডেভেলপমেন্ট এর মাধ্যমে গেমের সার্বিক ভিজুয়ালের এক বিরাট অংশ এই সেক্টরটির ওপর নির্ভর করে।

ক্যারেক্টার ডিজাইন

প্রপ্স ডিজাইন

অ্যানিমেশান

অ্যানিমেশান একটি গেমে দৃশ্যমান বিষয়বস্তুতে প্রাণ সঞ্চার করে। এই সেক্টরটিও গেম ডেভেলপমেন্টে একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ক্যারেক্টার থেকে শুরু করে যাবতীয় যা কিছু অ্যানিমেটেবল, তার লক্ষ্য অনুযায়ী অ্যানিমেশান-রেডি মডেলগুলোকে রিগিং শেষে গেম অ্যানিমেশান আর্টিস্টরা বিভিন্ন রকমের এক্সস্প্রেশান সম্বলিত ফ্রেম বাই ফ্রেম অ্যানিমেশান তৈরি করে থাকে। মডেলিং, রিটপোলজি, ইউভি সেটিং এবং টেক্সচারিং এর মতই অ্যানিমেশানে টেকনিক্যাল এবং অ্যাসথেটিক উভয় রকমের দক্ষতার প্রয়োজন হয়। সচরাচর ক্ষেত্রে গেম ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যান্ডার্ড 3D অ্যানিমেশান সফটওয়্যার হিসেবে এখনো Autodesk Maya-কেই বিবেচিত করা হয়ে থাকে। 2D অ্যানিমেশানের জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে Adobe Photoshop, Animate CC, Toon Boom এবং After Effects সহ আরও বেশ কিছু জনপ্রিয় সফটওয়্যার।

3D রিগিং এবং অ্যানিমেশান

2d অ্যানিমেশান 

ইউজার ইন্টারফেস ( UI ) ডিজাইন

একটি গেমের ফাংশনালিটি ইউজারের কাছে সহজবোধ্যভাবে উপস্থাপন করতে গেম স্ক্রিনে গেমটিকে পরিচালনাকারী বিভিন্ন রকমের অপশন,টিউটোরিয়াল ও ফিচার সম্বলিত ইন্টারফেস ব্যবহার করা হয় যা মূলত গেম ডিজাইনার এবং গেম ইউজার ইন্টারফেস ডিজাইনার একসাথে মিলে একটি অভঙ্গুর ফরম্যাটে তৈরি করে থাকে। ডিজাইনারের খসড়া থেকে শিল্প নির্দেশনা অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট আর্ট স্টাইলের আওতায় ইন্টারফেস ডিজাইনার চূড়ান্ত ভিজুয়াল ইলামেন্টস (বাটন, আইকন, টেক্সট ফন্ট নির্বাচন ও অন্যান্য এসথেটিকাল কন্টেন্ট) নির্মাণ করে। সাধারণত UI ডিজাইনে সর্বাধিক ব্যবহৃত সফটওয়্যারগুলো হল Adobe Photoshop এবং Adobe Illustrator. সম্প্রতি বিভিন্ন AAA গেমস-এর UI ডিজাইনে 2D সফটওয়্যারের সাথে সাথে 3D সফটওয়্যারেরও ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে।

UI Design

ভিজুয়াল এফেক্টস এবং পার্টিক্যালস

গেম আর্টের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে ভিজুয়াল এফেক্টস ও পার্টিক্যাল মেকিং। কম বেশি সব ধরণের গেমে চলমান যেকোনো অ্যাকশান, গতি বা মুভমেন্টকে ( যেমনঃ আগুন, পানি, বিস্ফোরণ, ধোঁয়া ইত্যাদি ) সাবলীল ও জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে গেম ভিজুয়াল এফেক্টস ও পার্টিক্যাল আর্টিস্টরা তাদের এস্থেটিক্যাল ও ফিজিক্স নলেজকে কাজে লাগিয়ে তৈরি করে থাকে বিভিন্ন রিয়ালিস্টিক ও আনরিয়ালিস্টিক এফেক্টস ও পার্টিক্যালস যা একটি গেমের ভার্চুয়াল জগতটাকে করে তোলে আরও প্রানবন্ত। বেশিরভাগ সময় Unity, Unreal Engine প্রভৃতি গেম ইঞ্জিনসমূহেই এই ক্রিয়েটিভ ভিজুয়াল ডেভেলপমেন্টগুলো সম্পাদন হয়ে থাকে যাতে করে সরাসরি ইন-গেমে এইসব ইফেক্টস-এর পারফরম্যান্স নিয়ন্ত্রন করা যায়।

পার্টিক্যাল মেকিং

  • পোস্ট-প্রডাকশান পিরিয়ডে গেম আর্টঃ

গেম আইকন এবং গ্রাফিক্যাল কন্টেন্ট ক্রিয়েশান

প্রোডাকশান পরবর্তী সময়ে বা গেম রিলিজ-এর পূর্ববর্তী সময়ে গেম আর্টিস্টকে  প্রোডাকশান রিকুয়ারমেন্ট অনুযায়ী একটি আকর্ষণীয় গেম আইকন ইলাস্ট্রেট এবং কিছু প্রমোশনাল গেম-প্লে স্ক্রিন, কভার আর্ট বা ভিডিও কন্টেন্ট ক্রিয়েট করতে হয় যা বিভিন্ন সোশ্যাল প্লাটফর্মে দেখে ইউজারেরা যাতে গেমটির প্রতি আগ্রহী হয় এবং গেমটি ডাউনলোড করতে উৎসাহী হয়। এই কন্টেন্ট ক্রিয়েশানে গেম আর্টিস্টকে একটি সুদক্ষ মার্কেট এনালাইসিস টিম বিভিন্ন রকমের তথ্য ও ইনসাইটস শেয়ারের মাধ্যমে দিক নির্দেশনা দিয়ে কন্টেন্ট-এর মান নিশ্চিত করে থাকে। এছাড়াও ছোট বড় বিভিন্ন গেমের ট্রেলার মেকিং-এও গেম আর্টিস্টরা ক্রিয়েটিভ টিমে কাজ করে থাকে।

গেম আইকন ডিজাইন

  • পেশাদার গেম আর্টিস্টের কিছু প্রয়োজনীয় গুণাবলীসমূহ
  • ZIPPIA এর সমীক্ষায় দেখা যায় যে, সমগ্র গেম ইন্ডাস্ট্রির ৭৮.৮% গেম আর্টিস্ট সাধারণত 3D মডেলিং, অ্যানিমেশান, গ্রাফিক ডিজাইন অথবা গেমস আর্টের ওপর ব্যাচেলর ডিগ্রিধারী এবং মাত্র ৫.৯% গেম আর্টিস্ট মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিক থেকে সিংহভাগই কলেজ ডিগ্রিধারী হলেও কম্পিউটার বেইজড আর্ট এর উপর প্রবল আগ্রহ, মেধা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা থাকলে মাধ্যমিক শিক্ষাসম্পন্ন কিংবা কোন ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী ছাড়াও একজন গেম আর্টিস্ট হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলা সম্ভব। 
  • ক্রিয়েটিভ এবং ইনোভেটিভ চিন্তাধারাসম্পন্ন হওয়া।
  • ভালো টিম প্লেয়ার হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার মন-মানসিকতা থাকা।
  • গেম আর্ট সম্পর্কিত নতুন নতুন বিষয়বস্তু জানা এবং আনন্দের সাথে সেসব শেখার ধৈর্য ও ইচ্ছা পোষণ করা।
  • আর্টিস্ট এবং নন-আর্টিস্ট সদস্যদের ফিডব্যাক এবং অপিনিয়ন সাবলীলভাবে শোনা এবং বোঝার আগ্রহ থাকা এবং অন্যকে সুন্দরভাবে ফিডব্যাক দিতে পারা।
  • এফিসিয়েন্ট ওয়ার্ক-ফ্লো ফলো করা।
  • গেমিং এর প্রতি সহজাত আকর্ষণ থাকা।
  • নতুন চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করার মত উদ্যমী এবং চ্যালেঞ্জকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে না দেখে বরং নতুন কিছু শেখার ক্ষেত্র হিসেবে দেখার মত মনোবল অর্জন করা।